জুলাই ২০২৬ মাসিক মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদন: মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রবণতা বিশ্লেষণ

ডেটা উৎস ও সীমাবদ্ধতা

এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের অন্যতম ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা যথা রিউমার স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব, বুম বিডি এবং ফ্যাক্ট ওয়াচ-এর প্রকাশিত ডেটা ও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর কাজের পরিধির বাইরে কেউ যদি কোনো মিসইনফরমেশন বা ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে থাকে, অথবা কোনো ভুল তথ্য যদি ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর নজরে না পড়ে, সেক্ষেত্রে সেগুলো এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আরেকটি বিষয় হলো, একটি নির্দিষ্ট মিস বা ডিসইনফরমেশন নিয়ে যদি একাধিক ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তবে তা বিশ্লেষণে একবারই গণনা করা হয়েছে।

মোট ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদন ও মিসইনফরমেশনের পরিমাণ

জুলাই ২০২৬ মাসে সংবাদমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর গুণগত প্রভাব এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে যা পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই মাসে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো মোট ৬০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ১০টি ঘটনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে প্রতিবেদন করেছে। এগুলোকে একবার গণনা করে ৫০টি স্বতন্ত্র ভুল বা অপতথ্যের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংবাদ বা সংবাদমাধ্যমভিত্তিক অপতথ্যের তালিকা

সংবাদমাধ্যমগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং পেশাদারিত্বের মানদণ্ড রক্ষা করতে কোন প্রতিষ্ঠান কতটি ভুল তথ্য প্রচার করেছে তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। নিচের টেবিলে জুলাই মাসে অপতথ্য ছড়ানোয় সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর তালিকা প্রদান করা হলো:

মূলধারার প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা পেশাদারিত্বের মানদণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিশেষ করে শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নাম এই তালিকায় বারবার আসা সাংবাদিকতার নৈতিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। সংবাদমাধ্যমগুলোর তালিকা পর্যালোচনার পর এবার আমরা অপতথ্যগুলোর বিষয়ভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণ করব।

মিস ও ডিসইনফরমেশনগুলোর ধরন বিশ্লেষণ

জুলাই মাসে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যগুলোকে মূলত পাঁচটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়, যা জনমনে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে:

১. খেলাধুলা ও ফুটবল বিশ্বকাপ: এই মাসের অপতথ্যের বড় অংশ ছিল ফুটবল কেন্দ্রিক। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের পর হোসে মরিনহোর নামে ভুয়া উক্তি (“দিনের আলোতে ডাকাতি”), টনি ক্রুসের বানোয়াট মন্তব্য এবং নেইমারের কাছে নরওয়ের গোলরক্ষকের ক্ষমা চাওয়ার মতো ভিত্তিহীন খবর মূলধারার প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়েছে।

২. বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মানবিক আবেগকে পুঁজি করা হয়েছে। সন্তানকে আগলে রাখা বাবার পুরোনো ভিডিও বা রেললাইনে মাছ পাওয়ার পুরোনো ভারতীয় ভিডিওকে সাম্প্রতিক বন্যার দৃশ্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা তথ্যশূন্যতার সুযোগে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর গুজব: এআই কনটেন্ট শনাক্তে সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যর্থতা ছিল প্রকট। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিদায় ঘিরে ড্রোন শো, ভোলার মেঘনায় পানির ওপরে ইলিশের ভিডিও এবং স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের উদ্‌যাপনের ভিডিওগুলো ছিল মূলত এআই নির্মিত, যা অনেক সংবাদমাধ্যম বাস্তব হিসেবে প্রচার করেছে।

৪. আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনীতি: টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের বিমান হামলার দাবিতে পুরোনো ভিডিও প্রচার এবং মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সারের মন্তব্যকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নামে প্রচারের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও ট্রাম্প ও ইয়ামালের করমর্দন না করার ভুয়া তথ্যটিও বহুল প্রচারিত হয়েছে।

৫. জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় খবর: শাহরুখ খানের ২০২৩ সালের পুরোনো ভিডিওকে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা বা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের গ্রেপ্তারের ভুয়া খবরের মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

প্রবণতা বিশ্লেষণ

জুলাই মাসের প্রধান ইভেন্টগুলোর সাথে মিসইনফরমেশনের বিস্তারের একটি কৌশলগত সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন তারকা খেলোয়াড় ও কোচদের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি প্রচার করে অতি-আবেগ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে, বন্যা পরিস্থিতির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে পুরোনো এবং ভুল ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ছড়িয়ে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।

সাধারণ পাঠকরা এই তথ্যগুলো দ্রুত বিশ্বাস করার কারণ হলো, এই তথ্যগুলো তাদের তৎকালীন আবেগীয় অবস্থানের সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল। যখন মূলধারার সংবাদমাধ্যম এই ধরনের গুজব প্রচার করে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং এর সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ক্ষতিকর হয়।

সাধারণ প্রবণতার বাইরেও সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজস্ব ব্যবসায়িক ও কাঠামোগত আচরণের একটি নির্দিষ্ট ট্রেন্ড লক্ষ্য করা গেছে।

এ প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের রিসার্চ অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ভলান্টিয়ার চাঁদনী আক্তার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top