মুহাম্মদ আবদুল মুকিম
—
বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘এনপিবি নিউজ’ (NPB News)-এর ফেসবুক পেজ ও ওয়েব পোর্টালে পরিবেশিত সংবাদ এবং শিরোনামগুলোর ওপর পরিচালিত এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, সংবাদমাধ্যমটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা ও ভিউ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পদ্ধতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর সাংবাদিকতার আশ্রয় নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত এমন সব শিরোনাম তৈরি করে, যা প্রকৃত খবরের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এছাড়া কিছু সংবাদের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার পর তারা ফেসবুক পোস্টগুলো সম্পাদনা বা সংশোধনও করে।
বিভ্রান্তিকর শিরোনামের মাধ্যমে জনমনে ভ্রান্তি সৃষ্টি
এনপিবি নিউজ এমন কিছু শিরোনাম ব্যবহার করে যা সাধারণ পাঠকদের মনে সমসাময়িক জাতীয় ঘটনার সম্পূর্ণ ভুল অর্থ তৈরি করে।
উদাহরণস্বরূপ, গত ১১ জুলাই মাদারীপুর সদর মডেল থানা থেকে হাসিনা বেগম (৩৫) নামের একজন নারী আসামি পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে ঢাকা থেকে পুনরায় গ্রেফতারের খবরটিকে তারা ফেসবুকে প্রচার করে “পালিয়ে যাওয়া হাসিনা গ্রেফতার” শিরোনামে।

পাঠকেরা মনে করেন যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যূত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়েছেন। এই অস্পষ্টতার কারণে মানুষ কীভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে তা প্রমাণ করতে পাঠকদের কমেন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। ফেসবুক ব্যবহারকারী ‘এমিড ইশান’ মন্তব্য করেন, “এই হাসিনা ওই হাসিনা নয়।” অন্যদিকে ‘Md Yousuf’ নামে আরেক ব্যবহারকারীকে এ খবরে বিভ্রান্ত হতে দেখা যায়। কমেন্টে তিনি লেখেন, “যেই দেশনেত্রী মৃত্যুকে ভয় পায় না, তাকে গ্রেফতারের ভয় দেখায় লাভ নেই।”
সংবাদমাধ্যমের এমন অপেশাদার আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ‘Mizanur Rahman’ অন্য একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “শোনেন, আপনাদের নিউজ কিন্তু মানুষ দেখে বা পড়ে। এমনভাবে নিউজ করেন, তাতে আপনি বা আপনারা গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছেন। একটু কমেন্টগুলো পড়বেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।”
একইভাবে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রবিউল ইসলামকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অব্যাহতি দেওয়া হলে গত ১ আগস্ট “বিএনপি নেতা রবিউলকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি” শিরোনামে তারা একটি ফেসবুক পোস্ট প্রকাশ করে। এই অস্পষ্ট শিরোনামের কারণে পাঠকেরা মনে করেন যে, বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে মন্ত্রণালয় বা বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ‘Shahabuddin Ahmed’ নামে এক ব্যবহারকারীর কমেন্টে; তিনি লেখেন, “আমি মনে করলাম কোন মন্ত্রী!” পেজটির এমন চতুরতার সমালোচনা করে ‘Zahed Haque EG’ নামের অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হয়, “ভিউ বাড়ানোর কত চালাকী! সবাই হেডিং দেখে মনে করবে, মন্ত্রী রবিউল!”
আন্তর্জাতিক সংবাদকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন
আন্তর্জাতিক সংবাদের ক্ষেত্রে দেশের নাম বা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান গোপন রেখে সেগুলোকে স্থানীয় বা জাতীয় ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা এনপিবি নিউজের আরেকটি সাধারণ কৌশল।
ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের খবরটি গত ২০ জুলাই তারা “চরম উত্তেজনা, ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে ছাত্ররা” শিরোনামে প্রচার করে। খবরটির ক্যাটাগরি ভারতের অন্তর্গত হলেও শিরোনামে সেটি গোপন করায় বাংলাদেশের পাঠকেরা এটিকে দেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী চলমান অস্থিরতা বলে ভুল করেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘Sharif Hero’ নামের অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হয়, “স্থান কাল পাত্র ছাড়া এই টাইপ সংবাদ শিরোনাম দিলে এদের ব্লক মারা উচিত।”

এছাড়া, ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর দেশটির রাজধানী বুয়েনস আইরেসে ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনাকে তারা “আর্জেন্টিনার হারে রাজধানীতে তাণ্ডব, মুখোমুখি পুলিশ-সমর্থক” শিরোনামে একইদিন অর্থাৎ ২০ জুলাই ফেসবুকে প্রকাশ করে। স্থান বা দেশের উল্লেখ না থাকায় বাংলাদেশের পাঠকেরা মনে করেন যে ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেছে।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সম্পাদনা: ভিউ নিশ্চিত করে শিরোনাম পরিবর্তন
এনপিবি নিউজ চাঞ্চল্যকর শিরোনাম তৈরি করে রিঅ্যাকশন বৃদ্ধির পর কিছুক্ষেত্রে উক্ত ফেসবুক পোস্ট পরবর্তীতে সম্পাদনা বা এডিট করে দেয়।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ খান মেনন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাকে তারা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করে। এ ঘটনায় ২১ জুন প্রথম পোস্ট করা হয় ‘রাশেদ খান মেননের মৃত্যু’, যাতে রিঅ্যাকশন যুক্ত হয় ৪৯১টি। সাধারণ মানুষ মনে করেছিলেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন মারা গেছেন। একই দিনে পোস্টটি এডিট করে আরও চাঞ্চল্যকরভাবে লেখা হয় ‘ছাদ থেকে লাফ দিয়ে রাশেদ খান মেননের মৃত্যু’, যার ফলে একলাফে নতুন রিঅ্যাকশন যুক্ত হয় ১,১২৪টি। পরবর্তীতে সত্য প্রকাশে বাধ্য হয়ে পরের দিন পুনরায় এডিট করে লেখা হয় ‘আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ খান মেননের মৃত্যু’; এক্ষেত্রে নতুন করে রিঅ্যাকশন যুক্ত হয় ২৩৪টি।

একইভাবে, ৩০ জুন প্রথমে পোস্ট করা হয় “মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল”, যাতে পাঠকেরা বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার পরিবর্তনের কথা ভেবে ৩৪১টি রিঅ্যাকশন দেন। পরবর্তীতে সেটি সংশোধন করে “ভারতের মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল” লেখার পর নতুন করে রিঅ্যাকশন পড়ে মাত্র ৩৪টি। এটি সুস্পষ্টভআবে প্রমাণ করে যে, চাঞ্চল্য তৈরি করে কৃত্রিমভাবে রিঅ্যাকশন বা ভিউ বাড়ানো এবং পরবর্তীতে তা এডিট করে সত্য তথ্য প্রকাশ করা তাদের নিয়মিত একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
বিনোদন সাংবাদিকতার নামে স্পর্শকাতর শব্দের অপব্যবহার
বিনোদন জগতের তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে স্পর্শকাতর শব্দের ব্যবহার করে ক্লিকবেইট সংবাদ ছড়ানো এনপিবি নিউজের অন্যতম চরিত্র।
তারা একজন মডেল ও অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে ১৯ আগস্ট “অভিনেত্রী মিথিলার গোপন ভিডিও ফাঁস” (ফেসবুকে: “অভিনেত্রী মিথিলার ভিডিও ফাঁস, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়”) শীর্ষক শিরোনাম ব্যবহার করে। খবরের বিস্তারিত অংশে তারা উল্লেখ করেছেন, “মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ তানজিয়া জামান মিথিলা রূপের জাদুতে নিয়মিতই মুগ্ধ করেন ভক্তদের। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের একটি বিলাসবহুল ইয়টে লাল বিকিনি পরে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছেন এই অভিনেত্রী ও মডেল। ইয়টে নেওয়া তার বিভিন্ন লুকের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পরপরই তা ইন্টারনেটে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।” অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা উল্লিখিত অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিওকে তারা ‘গোপন ভিডিও ফাঁস’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে চটকদারভাবে প্রচার করেছেন।
এছাড়া ভারতের অন্য একজন অভিনেত্রীর ক্ষেত্রেও ২০ আগস্ট প্রকাশিত সংবাদে একই ধরনের শিরোনাম ব্যবহার করতে দেখা যায়; তারা লেখেন, “অভিনেত্রী নেহার ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস, মুহূর্তে ভাইরাল।” এক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত উক্ত অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিওকে ঘিরে তারা এমন শিরোনাম প্রচার করেছে।
‘ভিডিও ফাঁস’ ও ‘ভিডিও ভাইরাল’ শব্দগুচ্ছ সার্চ করে আরও কিছু সংবাদ তাদের ওয়েব পোর্টালে পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “ট্রুডো-কেটি পেরির অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল, উত্তাল নেটদুনিয়া”, “কাশবনে ‘অন্তরঙ্গ মুহূর্তে’ আরিফিন শুভ ও ঐশী, ভিডিও ভাইরাল” ইত্যাদি, যা স্পর্শকাতর শিরোনামে বিভ্রান্তিকর ও অপেশাদার বিনোদন কনটেন্ট হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
শুধু তারকা নয়, সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের ব্যাপারেও তাদেরকে এমন স্পর্শকাতর শব্দ ব্যবহার করতে এবং ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ‘অন্তরঙ্গ’ শব্দটি তাদের ফেসবুক পেজে সার্চ করে “মেট্রোরেলে তরুণ-তরুণীর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত” শিরোনামে গত ২৪ মার্চের একটি পোস্ট পাওয়া যায়, যেখানে ঢাকার মেট্রোরেলে যাতায়াতরত দুজন তরুণ-তরুণীর ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এনপিবি নিউজের এই কর্মকাণ্ডসমূহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিউ এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের সংবাদ ও কন্টেন্টগুলো সাধারণ পাঠক ও ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি:
গত ২১ জুন এ পর্যবেক্ষকের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিউজফিডে এনপিবি নিউজের পেজ থেকে পোস্টকৃত “রাশেদ খান মেননের মৃত্যু” শিরোনামে পোস্টটি আসে। সংবাদটির বিস্তারিত অংশ পড়ে শিরোনামটি বিভ্রান্তিকর মনে হলে পেজটিকে পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণের জন্য নজরে রাখা হয়। গত দুই মাসের পর্যবেক্ষণে উপর্যুক্ত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পোস্টসমূহ তাদের ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়।