ডেটা উৎস ও সীমাবদ্ধতা
এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা—রিউমার স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব, ফ্যাক্ট ওয়াচ, এএফপি ফ্যাক্ট চেক, আজকের পত্রিকা এবং বুম বিডি-এর আগস্ট ২০২৬ মাসে প্রকাশিত ডেটা ও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর কাজের পরিধির বাইরে কেউ যদি কোনো মিসইনফরমেশন বা ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে থাকে, অথবা কোনো ভুল তথ্য যদি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর নজরে না পড়ে, সেক্ষেত্রে সেগুলো এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আরেকটি বিষয় হলো, একটি নির্দিষ্ট মিস বা ডিসইনফরমেশন নিয়ে যদি একাধিক ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তবে তা বিশ্লেষণে একবারই গণনা করা হয়েছে।
মোট ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদন ও মিসইনফরমেশনের পরিমাণ
আগস্ট মাসে সংবাদমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মোট ৬৮টি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ঘটনা একাধিক ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা দ্বারা যাচাই করা হয়েছে (ডুপ্লিকেট)। ডুপ্লিকেট তথ্যগুলোকে একবার কাউন্ট করে আগস্ট মাসে সব মিলিয়ে ৫২টি স্বতন্ত্র ভুল বা অপতথ্যের ঘটনা পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো প্রচার করেছে।
২০২৬ সালের আগস্ট মাসে কোন সংবাদ বা সংবাদমাধ্যম মোট কতগুলো ভুল বা অপতথ্য ছড়িয়েছে, তার তালিকা
- সবচেয়ে বেশি (৭টি) ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: জাগরণ নিউজ।
- ৬টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: এনপিবি নিউজ এবং যুগান্তর (দৈনিক যুগান্তর)।
- ৫টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: ইনকিলাব (দৈনিক ইনকিলাব), নিরপেক্ষ, এবং বাংলাদেশ টাইমস।
- ৪টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: আরটিভি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি, কালবেলা, ঢাকা মেইল, এবং মাছরাঙা টিভি।
- ৩টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: আমার দেশ, ইত্তেফাক (দৈনিক ইত্তেফাক), এশিয়া পোস্ট, চ্যানেল আই, টাইমস টুডে, ঢাকা ওয়াচ, দেশ টিভি, বাংলা টিভি, বিডি২৪রিপোর্ট, মানবকণ্ঠ (দৈনিক মানবকণ্ঠ), রূপালী বাংলাদেশ, সময় টিভি, এবং সময়ের কণ্ঠস্বর।
- ২টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: আজকের পত্রিকা, আজাদির ডাক, একুশে টিভি, এদিন, এনটিভি, কালের কণ্ঠ, গণকণ্ঠ, জনবাণী, জাগোনিউজ২৪, টাইম টেলিভিশন, ডেইলি বাংলাদেশ, ডেইলি সান, ঢাকা প্রকাশ, নাগরিক প্রতিদিন, নিউজজি২৪, প্রতিফলন, প্রবাস টাইম, বাংলা এডিশন, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলাদেশ বুলেটিন, বিডি২৪লাইভ, ভোরের কাগজ, যায়যায়দিন, সংগ্রাম, সকালবেলা, সময়ের আলো, সোনালী নিউজ, এবং স্বদেশ বিদেশ।
- ১টি করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে: প্রথম আলো, বিবিসি বাংলা, একাত্তর টিভি, যমুনা টিভি, বাংলানিউজ২৪, আমাদের সময়, দৈনিক আজাদী সহ অন্যান্য জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
মিস ও ডিসইনফরমেশনগুলোর ধরন বিশ্লেষণ
আগস্ট মাসে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করলে প্রধানত কয়েকটি ক্যাটাগরি দেখা যায়:
১. নেপালের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: আগস্টে নেপালের বন্যা ও ভূমিধসকে কেন্দ্র করে প্রচুর গুজব ছড়ানো হয়। ভারতের ২০২৫ সালের পুরোনো বন্যা, আসামের উদ্ধার তৎপরতা, ফিলিপাইনের ঘর ধসে পড়ার ভিডিও এবং পাকিস্তানের পুরোনো দৃশ্যকে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা বলে প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার পুরোনো ভূমিকম্পের দৃশ্যকেও সাম্প্রতিক বলে প্রচার করা হয়।
২. আন্তর্জাতিক ঘটনা ও প্রশাসনিক ভ্রান্তি: যুক্তরাষ্ট্রের সকল ভিসা স্থগিতের ভুয়া খবর প্রচার, সিদ্ধিরগঞ্জের অন্য সাহাবুদ্দিনের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিষয় ভেবে ভুল রিপোর্ট করা, জিম্বাবুয়ে ও নাইজেরিয়ার নৌকাডুবির খবরে কঙ্গোর পুরোনো ফুটেজ ব্যবহার, এবং জো বাইডেনের ক্যান্সারের সম্পাদিত ছবি প্রচার করা হয়েছে।
৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর গুজব: সাপের সাথে নারীর লড়াই, শিশু ও গরিলার দড়ি টানাটানি, বারান্দার সুইমিংপুল ফেটে যাওয়া, নাহিদ রানার বিয়ের ছবি, এবং ছাত্রলীগের মিছিলে লোকসংখ্যা বাড়ানোর দৃশ্যকে এআই জেনারেটেড জানা সত্ত্বেও বাস্তব বলে প্রচার করা হয়।
৪. জাতীয় রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা: নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেউবা ক্ষমতাচ্যুত হননি, ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুরের মামলা খারিজের ঘটনা, এবং নারায়ণগঞ্জের ‘ডন’ শিরোনামে স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব বলে ছড়ানো হয়েছে।
প্রবণতা বিশ্লেষণ
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট মাসে অপতথ্য ছড়ানোর সবচেয়ে বড় দুটি ট্রেন্ড ছিল—আন্তর্জাতিক দুর্যোগ (বিশেষ করে নেপালের বন্যা) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংক্রান্ত প্রশাসনিক খবর নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম প্রকাশ করা। এছাড়া এআই দিয়ে তৈরি অতিপ্রাকৃত দৃশ্য যাচাই না করে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরাসরি নিউজে তুলে আনার প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল।
একাধিক ভুল বা অপতথ্য ছড়ানো সংবাদমাধ্যমগুলোর (যেমন: জাগরণ নিউজ, এনপিবি নিউজ, যুগান্তর, ইনকিলাব) কাজের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজিটাল ভেরিফিকেশনের অভাব ও অতিরিক্ত তড়িঘড়ি করা এর প্রধান কারণ। বিশেষ করে বিদেশী সংবাদ বা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সত্যতা যাচাই না করে দ্রুত ভিউ ও ক্লিক পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার ঝোঁক দেখা গেছে।
এ প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের রিসার্চ অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ভলান্টিয়ার চাঁদনী আক্তার