গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালেমা খচিত পতাকার প্রদর্শন পরিলক্ষিত হয়। দেশের কোথাও কোথাও এ ধরনের পতাকা সংবলিত র্যালি অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে, আবার কোনো কোনো স্থানে তা উড্ডীন অবস্থায় দেখা গেছে। কালেমা খচিত পতাকা কেন্দ্রিক এই ঘটনাসমূহকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচার করেছে।
এ প্রেক্ষিতে প্রকাশিত সংবাদসমূহ পর্যালোচনা করেছে ‘বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর’। এই পর্যালোচনার আওতায় ২১টি ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ২২টি লিখিত প্রতিবেদন এবং ১০টি ভিডিও প্রতিবেদনসহ মোট ৩২টি প্রতিবেদন নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মূল্যায়িত এই প্রতিবেদনগুলোর সময়কাল ছিল মূলত ১৩ জুন থেকে ৩ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত।
প্রসঙ্গত বিষয়টি নিয়ে গত ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সচিবালয়ে সমসাময়িক ঘটনাবলী সংক্রান্ত এক সংবাদ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ‘আরবি হরফ সংবলিত পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় কারা জড়িত’ এরূপ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ ব্যক্ত করেন যে, কিছু গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার চেষ্টা করতে পারে এবং তাদের চরমপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশে কোনো সুসংগঠিত জঙ্গিবাদী তৎপরতা কিংবা বড় ধরনের উগ্রবাদী সংগঠনের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে সরকার মনে করে না। (১৬ জুলাই, ইত্তেফাক)
পরবর্তীতে গত ২ জুলাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ওলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। সভায় উপস্থিত আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, পবিত্র কালেমা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানের মূল ভিত্তি ও গভীর শ্রদ্ধার পাত্র হলেও, বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট ধরনের কালেমা খচিত কালো পতাকা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতীকের সাথে মিলে যাওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
এতে আরও সতর্ক করা হয় যে, কোনো অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী এই সুযোগ নিয়ে মিছিল বা সমাবেশে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে পরিস্থিতি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে, যা ইসলাম, মুসলিম সমাজ ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। (২ জুলাই, জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর)
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি বা ন্যারেটিভের আলোকে উক্ত বিষয়টির প্রতিবেদন প্রচার করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো হলো: ইতিবাচক তথা ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ, নেতিবাচক তথা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক সংকেত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ও সতর্ক অবস্থান এবং নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
ইতিবাচক বা ধর্মীয় আবেগ হিসেবে উপস্থাপনকারী সংবাদমাধ্যম
দৈনিক আমার দেশ, নয়া দিগন্ত এবং বৈশাখী টিভি সহ কতিপয় সংবাদমাধ্যম উক্ত বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নপূর্বক মুসলিম সম্প্রদায়ের সাধারণ আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় “দিনাজপুরে কালেমার পতাকা নিয়ে বাইক র্যালি অনুষ্ঠিত” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। উক্ত সংবাদের উপশিরোনামে উল্লেখ করা হয়, “ইসলামের বিজয় ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়া এবং কালেমার পতাকার ছায়াতলে মুসলিম জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।”
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় এ সংক্রান্ত দুটি পৃথক সংবাদ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল যথাক্রমে “রংপুরে কালিমার পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ” এবং “কালেমার পতাকা নিয়ে মোটরসাইকেল র্যালি অনুষ্ঠিত”।
অপরদিকে, বৈশাখী টিভির ইউটিউব শর্টসের একটি ভিডিওর শিরোনাম ও থাম্বনেইলে উল্লেখ করা হয়, “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন না করে কালেমার পতাকা নিয়ে বর্ণাঢ্য মিছিল!”
সামগ্রিকভাবে, এই সংবাদমাধ্যমসমূহের অভিমত হলো, ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যখন দেশব্যাপী ভিন্ন দেশের পতাকা উত্তোলনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তখন একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে কালেমা সংবলিত পতাকা প্রদর্শন করা সাধারণ মুসলিমদের ধর্মীয় কর্তব্য। এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের ‘তৌহিদী ছাত্র জনতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং প্রচার করা হয়েছে যে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামের শান্তি ও বিজয়ের বার্তা প্রচার করা। একই সাথে, এই কার্যক্রমের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নেই বলেও তারা দাবি করেছে।
নেতিবাচক বা জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপনকারী সংবাদমাধ্যম
বাংলা স্ট্রিম, ঢাকা স্ট্রিম, এনপিবি নিউজ এবং বিডিনিউজ২৪-এর মতো মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত কলামে এই ইস্যুটিকে গভীর উদ্বেগ ও অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও এসব সংবাদমাধ্যমের মতে, এটি নিছক কোনো ধর্মীয় আবেগ নয়। এই পতাকাগুলোর নকশা আল-কায়েদা, আইএস, তালেবান এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরীরের ব্যবহার করা পতাকার সাথে হুবহু মিলে যায়। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে একটি ‘উগ্রবাদী ও মৌলবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার একটি পরিকল্পিত ছক।
এনপিবি নিউজ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন চীন ও মালয়েশিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছেন, তখন এই ধরনের উগ্রবাদী প্রতীকের প্রদর্শন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং শ্রমবাজারে চরম ভুল বার্তা দিতে পারে।
চ্যানেল আই-এর টকশোতে একে সমাজে ‘ভয়ের রাজত্ব’ কায়েমের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, রাস্তায় লাগানো এই পতাকা ছিঁড়ে গেলে বা কেউ নামাতে গেলেই ধর্ম অবমাননার ধোঁয়া তুলে মব জাস্টিস বা দাঙ্গা বাঁধানোর ক্ষেত্র তৈরি করা হতে পারে।
সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান তুলে ধরা সংবাদমাধ্যম
দেশ রূপান্তর, নিউজ২৪, এটিএন নিউজ, এবং বিডি টুডে-এর মতো সংবাদমাধ্যমগুলো সরকার ও পুলিশের সতর্ক ও কঠোর অবস্থানের দিকটিতে ফোকাস করেছে।
পুলিশের আইজিপি এবং সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহিদ উর রহমানের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই ঘটনার সাথে সরকারের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার একটি ষড়যন্ত্র হতে পারে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এটিকে চরমপন্থীদের নতুন ছক হিসেবে উল্লেখ করে সারা দেশের ইউনিটগুলোতে বিশেষ চিঠি ও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দারা ইতোমধ্যেই উস্কানিদাতা ২৪টি ফেসবুক আইডি ব্লক করেছে এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্পৃক্ততা খুঁজতে কাজ করছে।
নিরপেক্ষ ও অনুসন্ধানী কভারেজ
বিবিসি বাংলা, খবরের কাগজ, এবং ইত্তেফাক ইস্যুটির উৎস ও পেছনের ঘটনা খুঁজতে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করেছে।
বিবিসি বাংলা এবং ঢাকা স্ট্রিমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ইসলাম ধর্মে সুনির্দিষ্ট কোনো পতাকার ধারণা নেই। এই ট্রেন্ডটি মূলত শুরু হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুন ইজহারের একটি ফেসবুক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে, যেখানে তিনি বিদেশি পতাকার বদলে কালেমার পতাকা টানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে হারুন ইজহার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তিনি শুধু সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হিসেবে এটি বলেছিলেন, এত বড় শোডাউন বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বিবিসি বাংলা আরও জানিয়েছে, এই পতাকার নেপথ্যের কুশীলবদের নিয়ে ‘ঢাকা স্ট্রিম’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় তাদের অফিসে আগুন দেওয়া ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা একটি ভীতিকর পরিস্থিতি নির্দেশ করে।
এ প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের রিসার্চ অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ভলান্টিয়ার ফাহিম হাসান ও আসাদ উজ জামান