এপ্রিল ২০২৬ মাসিক মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদন: মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রবণতা বিশ্লেষণ

ডেটা উৎস ও সীমাবদ্ধতা

এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের অন্যতম ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা যথা রিউমার স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব, বুম বিডি এবং ফ্যাক্ট ওয়াচ-এর প্রকাশিত ডেটা ও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

তবে এক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর কাজের পরিধির বাইরে কেউ যদি কোনো মিসইনফরমেশন বা ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে থাকে, অথবা কোনো ভুল তথ্য যদি ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর নজরে না পড়ে, সেক্ষেত্রে সেগুলো এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আরেকটি বিষয় হলো, একটি নির্দিষ্ট মিস বা ডিসইনফরমেশন নিয়ে যদি একাধিক ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তবে তা বিশ্লেষণে একবারই গণনা করা হয়েছে।

মোট ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদন ও মিসইনফরমেশনের পরিমাণ

এপ্রিল মাসে সংবাদমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে মোট ২৮টি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই মাসিক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।  এর মধ্যে ২টি ঘটনা (যথা, এআই দিয়ে তৈরি ‘গরুর ট্রেনের সামনে থেকে শিশুকে বাঁচানো’ এবং ‘জুস পান করে ইরানি সৈন্যের মিসাইল ছোঁড়া’) একাধিক ফ্যাক্ট-চেকার যাচাই করেছে। ডুপ্লিকেট তথ্যগুলোকে একবার কাউন্ট করে সব মিলিয়ে ২৬টি স্বতন্ত্র ভুল বা অপতথ্যের ঘটনা পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো এপ্রিল মাসে ছড়িয়েছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কোন সংবাদ বা গণমাধ্যম মোট কতগুলো ভুল বা অপতথ্য ছড়িয়েছে, তার তালিকা

মিস ও ডিসইনফরমেশনগুলোর ধরন বিশ্লেষণ

ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করলে প্রধানত কয়েকটি ধরন পরিলক্ষিত হয়।

১. আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি: এই ক্যাটাগরিতে ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং সিরিয়ার পুরনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক দাবি করে ছড়ানো হয়েছে।

২. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর গুজব: এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ও ছবিকে বাস্তব ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে। যেমন, ইরানি সৈন্যের জুস খাওয়া, গরুর বীরত্ব, ভোলা থানায় আসামির এআই ছবি, ড্রোন তৈরির কারখানা এবং মা তিমির দুগ্ধ পানের ভিডিও।

৩. ভিন্ন প্রেক্ষাপট বা সাজানো ভিডিও: অন্য দেশের (মূলত ভারত) ভিডিও বা পুরনো সাজানো ভিডিওকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে, যেমন, মেট্রো রেলে মারামারি, শিক্ষিকার রিলস দেখা, স্বর্ণ ছিনতাই, জাপানের পুরনো ভূমিকম্পের দৃশ্য ইত্যাদি।

৪. খেলাধুলা: ক্রিকেট ও ফুটবল তারকাদের নামে ভুয়া মন্তব্য এবং ভুল তথ্য প্রচার।

৫. জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় খবর: রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া বিবৃতি, পুরনো ছবিকে সাম্প্রতিক দাবি করা এবং প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত গুজব।

প্রবণতা বিশ্লেষণ

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি মিসইনফরমেশন ছড়ানোর ট্রেন্ড ছিল মূলত দুটি বিষয়ের উপর: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরান-ইসরায়েল ইস্যু) এবং এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে পুরনো এবং ভিন্ন দেশের ভিডিওকে নতুন বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল ব্যাপক। এছাড়া, প্রযুক্তিগত যাচাইয়ে সংবাদ ও গণমাধ্যমগুলোর দুর্বলতার কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি অতিপ্রাকৃত বা আবেগঘন দৃশ্যগুলো সহজেই সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে।

একাধিক ভুল বা অপতথ্য ছড়ানো গণমাধ্যমগুলোর ট্রেন্ড

একাধিক মিস বা ডিসইনফরমেশন ছড়ানোর তালিকায় সবার উপরে রয়েছে দৈনিক ইনকিলাব (৭টি ভুল)। এছাড়া কালবেলা (৩টি), বার্তা বাজার (৩টি), বিডি টুডে (৩টি), বিডি২৪রিপোর্ট (৩টি), বৈশাখী টিভি (৩টি) এবং যুগান্তর (৩টি) ভুয়া খবর ছড়িয়েছে।

একের অধিক ভুল করা সংবাদমাধ্যমগুলোর কাজের ধারা বিশ্লেষণ করলে তাদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ঝোঁক বা ট্রেন্ড দেখা যায়, সেটি হলো, ক্লিকবেট বা চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের তাড়না। ইনকিলাবের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত চাঞ্চল্যকর আন্তর্জাতিক ঘটনা (যেমন, মার্কিন পাইলট আটক, বিজেপি নেতার ভুয়া মন্তব্য) এবং এআই দিয়ে তৈরি অদ্ভুত ভিডিও (গরুর বীরত্ব, তিমির দুধ পান) কোনো প্রকার ডিজিটাল ভেরিফিকেশন বা সত্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, দ্রুত ভিউ পাওয়া এবং পাঠকদের চমকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশী বা ভাইরাল কনটেন্ট যাচাই-বাছাই না করেই ছেপে দেওয়ার একটি প্রবল প্রবণতা এই সংবাদমাধ্যমগুলোর মাঝে কাজ করেছে।

এ প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের রিসার্চ অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ভলান্টিয়ার চাঁদনী আক্তার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top