২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় ধারণকৃত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওই ভিডিওচিত্রটির সূত্র ধরে বিমান বাহিনীর গোপন তদন্তে বাহিনীর অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরিসহ একাধিক কর্মকর্তাকে ‘র’-এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর দাবি করা হয়।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বস্তুগোচর সত্যতা নিয়ে শুরুতেই বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রতিবাদলিপিতে স্পষ্টভাবে জানায় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর পেছনে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্কের ভিত্তি নেই; বরং তাদের প্রচলিত সামরিক আইন ও বিধি অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছে।
পরবর্তীতে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে খোদ তাহসিফ সুরি আমার দেশ পত্রিকার উক্ত সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এবং এটিকে একটি নির্দিষ্ট “প্রোপাগান্ডা সার্ভ” করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকার তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সুরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বিমান বাহিনীর সাবেক এ কর্মকর্তার পরিবারের দাবি, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রকাশিত সংবাদ জনপরিসরে, বিশেষত সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায়, গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের সংবাদে উত্থাপিত দাবির যথার্থতা, তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিবেদনের বর্ণনার সামঞ্জস্য পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হলো, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত নির্দিষ্ট প্রতিবেদনটির তথ্যগত ভিত্তি, সূত্রের স্বচ্ছতা, বক্তব্যের ভারসাম্য, ভাষাগত উপস্থাপনা এবং সংবাদ-ফ্রেমিং নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বীকৃত মানদণ্ডের আলোকে পর্যালোচনা করা। এর মাধ্যমে প্রতিবেদনে তথ্যগত অসঙ্গতি বা পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন রয়েছে কি না, তা যাচাইযোগ্য তথ্য ও উপাদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পত্রিকাটিতে সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদের লেখা “বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস” (আর্কাইভ লিঙ্ক) শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ‘আমার দেশ স্পেশাল’ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনের শব্দসংখ্যা ১৫৭০টি।

প্রতিবেদনটিতে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও সামরিক ইস্যু নিয়ে বড় ধরনের কিছু দাবি করা হলেও পেশাগত সাংবাদিকতার নীতিমালা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা ও উপস্থাপনার নিরিখে বেশ কিছু মৌলিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
আইনি প্রমাণের আগেই দোষী সাব্যস্তকরণের প্রবণতা
সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও ন্যায্য উপস্থাপনার ক্ষেত্রে অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল এবং আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নির্দোষিতার অনুমান এবং ন্যায়সংগত উপস্থাপনার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আলোচ্য প্রতিবেদনে একাধিক ব্যক্তিকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সমর্থনে প্রতিবেদনে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট, আদালতের রায় কিংবা সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো নিশ্চিত করে এমন দাপ্তরিক নথির উল্লেখ রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অভিযোগের ভাষা, দাবির পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদনটির উপস্থাপনাগত ভারসাম্য মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফকে সরাসরি “‘র’-এর সক্রিয় এজেন্ট” এবং “‘র’-এর শ্যাডো রিক্রুটার” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিমান বাহিনীর ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে কোনো আইনি নথি ছাড়াই ‘র’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলা হয়েছে। এছাড়া চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে “র’-এর সহায়ক শক্তি” এবং সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে “বাংলাদেশে ‘র’ নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি” হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

দাপ্তরিক নথিপত্র ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ঘাটতি
প্রতিবেদনটিতে পেশ করা চাঞ্চল্যকর দাবিগুলোর সপক্ষে কোনো শক্ত দাপ্তরিক দলিল বা নির্ভরযোগ্য নথির রেফারেন্স দেওয়া হয়নি।
যেমন, উল্লিখিত কর্মকর্তাদের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকা বা তথ্য পাচারের সপক্ষে কোনো কোর্ট মার্শালের নথি, এফআইআর বা কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি যুক্ত করা হয়নি।
অন্য জায়গায়, স্কোয়াড্রন লিডার আলতাফের ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে এফএন-৯০ ও সিগপি-২২৯ রাইফেল এবং এক কোটি নগদ টাকা উদ্ধারের যে কথা বলা হয়েছে, তার সপক্ষে কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রদত্ত অফিশিয়াল জব্দতালিকা বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য নেই।
এছাড়া উদ্ধারকৃত অস্ত্র এফএন-৯০ এবং সিগপি-২২৯ রাইফেল “ভারতীয় প্যারা কমান্ডোর ব্যবহার করা” বলে দাবি করা হলেও, এই বিশেষ অস্ত্র মডেল দুটি যে প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় প্যারা কমান্ডোরাই ব্যবহার করে, তার সপক্ষে কোনো সামরিক রেফারেন্স, দাপ্তরিক তথ্যসূত্র বা বিশেষজ্ঞ মতামতের উল্লেখ প্রতিবেদনে নেই।

অভিযুক্ত ও তাদের স্বজনদের বক্তব্যের অনুপস্থিতি
সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। পর্যালোচনাধীন প্রতিবেদনে যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার একটি প্রাসঙ্গিক দিক। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, কিংবা বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ার কোনো কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট তথ্যের উল্লেখ রয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফসহ বিমান বাহিনীর যে ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ‘র’ সংশ্লিষ্টতার জন্য চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে, তাদের কারো বক্তব্য নেওয়া হয়নি। তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
এছাড়া অভিযুক্ত চার পুলিশ কর্মকর্তা বা সাবেক সেনা কর্মকর্তার কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
কেবল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরির সঙ্গে ফোনে কথা বলার কথা উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি এ জাতীয় তথ্য বা নেটওয়ার্কের বিষয়ে কোনো সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
প্রতিবেদনের নিজস্ব দাবি ও প্রাতিষ্ঠানিক সোর্সের সরাসরি বৈপরীত্য
প্রতিবেদনটির বড় একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণযোগ্য দিক হলো এর নিজস্ব দাবি ও সংগৃহীত প্রাতিষ্ঠানিক সোর্সের বক্তব্যের মধ্যকার প্রত্যক্ষ বৈপরীত্য। প্রতিবেদনে এরকম দুটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে এক জায়গায় দাবি করা হয় যে ‘র’ সংশ্লিষ্টতার কারণে বিমান বাহিনীর ছয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে শনাক্ত করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরীর সরাসরি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, বিমান বাহিনীর এই ছয় কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক নয়, বরং “স্বাভাবিক অবসরে গেছেন”।
অন্য জায়গায় দাবি করা হয়েছে যে তদন্তে ‘র’-এর সঙ্গে জড়িত থাকা প্রমাণিত হওয়ায় স্কোয়াড্রন লিডার আলতাফের কোর্ট মার্শালে ১০ বছরের জেল হয়েছে। কিন্তু কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আবদুল্লাহ আল-মামুন নিশ্চিত করেন যে, আলতাফ বিমান বাহিনী অ্যাক্টের অধীনে “শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে” কোর্ট মার্শালে ১০ বছরের সাজা পেয়ে কারাগারে আছেন। তিনি আলতাফের বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত থাকার দাবির কথা বলেননি।
অনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎসনির্ভর বাক্যাংশের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
কোনো স্পষ্ট দাপ্তরিক উৎস, তদন্ত প্রতিবেদন, চার্জশিট, দায়িত্বরত তদন্তকারী কর্মকর্তা বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে মূল প্রতিবেদনে অনির্দিষ্ট উৎসনির্ভর বাক্যাংশ ব্যবহার করে একাধিক দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে “পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে”, “নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে” বা সমার্থক বাক্যাংশ মোট ৮ বার এবং “তদন্তে জানা গেছে”, “তদন্তে প্রকাশ” বা সমার্থক বাক্যাংশ মোট ৯ বার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের অনির্দিষ্ট ও উৎস-অস্পষ্ট দাবি মোট ১৭ বার প্রতিবেদনে ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রমাণহীন দাবির বারবার পুনরাবৃত্তি
শিরোনাম থেকে শেষ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর নাম ও এর বিভিন্ন শব্দবন্ধ/রূপভেদ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘র’ নেটওয়ার্ক মোট ৪ বার, ‘র’-এর সক্রিয় এজেন্ট বা এর রূপভেদ (শ্যাডো এজেন্ট/রিক্রুটার/এজেন্ট) মোট ৭ বার এবং ‘র’ সংশ্লিষ্টতা বা এর রূপভেদ (‘র’ কানেকশন/সহায়ক শক্তি/যোগসূত্র) মোট ৭ বার ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, এই তিনটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে মোট ১৮ বার শব্দবন্ধ ও রূপভেদ ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি, শিরোনামসহ পুরো প্রতিবেদনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর নাম মোট ১৯ বার উল্লেখ করা হয়েছে।

শব্দচয়ন ও আবেগপ্রবণ ফ্রেমিং
পেশাদার সাংবাদিকতায় শব্দচয়ন ও ভাষাগত উপস্থাপনা সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা এবং পাঠকের বিষয়টি অনুধাবনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আলোচ্য প্রতিবেদনে কিছু আলংকারিক, নাট্যধর্মী ও আবেগসূচক শব্দবন্ধের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এসব শব্দ ও বাক্যাংশ কীভাবে সংবাদের উপস্থাপনা এবং পাঠকের কাছে ঘটনার তাৎপর্য নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, তা সংবাদ-ফ্রেমিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনাযোগ্য।
প্রতিবেদনটিতে “কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ে” ধরনের প্রবাদ বা রটনামূলক বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ‘কালো হাত’, ‘ভয়াবহ সতর্কবার্তা’, ‘ভয়ংকর তথ্য’ ও ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’-এর মতো সংবেদনশীল ও চাঞ্চল্যকর শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।
তাছাড়া “র’ তাকে একটি ব্র্যান্ড নিউ হুন্দাই গাড়ি উপহার দিয়েছে” ও “তার কাছে নিয়মিত সুন্দরী নারী পাঠানো হতো” ধরনের অনাবশ্যক ও মুখরোচক দাবি তুলে ধরা হয়েছে, যার কোনোরকম আইনি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
উদ্দেশ্য আরোপ ও কৌশলগত ব্যাখ্যার প্রাসঙ্গিকতা
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের রুট ও মাধ্যমের তথ্য আড়াল করা এবং তিনি হেলিকপ্টারে করে ত্রিপুরায় যাচ্ছেন-এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রিফাত আশরাফী তাঁর অফিসকক্ষের জানালা থেকে ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে এই দাবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্য নির্ধারণের ভিত্তি এবং বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে উল্লিখিত উদ্দেশ্যের সম্পর্ক, দুটি বিষয়ই আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রমাণের ভিত্তিতে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
উক্ত কর্মকর্তার ছবি তোলা বা ভিডিও প্রকাশ করার পেছনে যে সুনির্দিষ্টভাবে এই বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যই ছিল, তা প্রতিবেদন কিংবা তদন্তকারী সংস্থা কীভাবে নিশ্চিত হলেন—তার পক্ষে কোনো লিখিত স্বীকারোক্তি, অফিশিয়াল তদন্ত বক্তব্য বা প্রত্যক্ষ প্রমাণের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ এমন উদ্দেশ্য অনুমানের ক্ষেত্রে উৎসের অনুপস্থিতি রয়েছে।
এছাড়া,’হেলিকপ্টারে ত্রিপুরা পালানোর ন্যারেটিভ’ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে উক্ত কর্মকর্তা কীভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর উদ্দেশ্য বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করলেন, এবং এর মাধ্যমে ‘র’ কীভাবে উপকৃত বা লাভবান হলো—তার কোনো যুক্তিসঙ্গত বা কৌশলগত ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই। ফলে বিষয়টি পুরোপুরি অস্পষ্ট এবং অনুমানভিত্তিক থেকে গেছে।
শিরোনাম, সূচনা ও ছবি
শিরোনামে “‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস” লেখা হয়েছে। ‘ফাঁস’ শব্দটি একটি অভিযোগকে আগেই প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরে নেয়। সূচনায় লেখা হয়েছে এয়ার ইন্টেলিজেন্স ‘র’-এর এক নেটওয়ার্ক “উদঘাটন” করেছে। পুরো সূচনায় ‘অভিযোগ’, ‘দাবি’ বা ‘অভিযুক্ত’ ধরনের কোনো সতর্কতাসূচক শব্দ নেই।
সংযুক্ত ইনফোগ্রাফিকের মাঝখানে একটি অস্ত্রের ছবি, যার ক্যাপশন “এফ এন-৯০ রাইফেল”। অস্ত্রের ছবিটি জব্দ-করা বস্তুর ছবি নাকি ‘ফাইল ছবি’ বা ‘প্রতীকী ছবি’—তা স্পষ্ট করা হয়নি। ছবিটির ক্রেডিট উল্লেখ না থাকলেও রিভার্স ইমেজ সার্চে ছবি সংরক্ষণ ও শেয়ার করার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Flickr-এ ছবিটির হুবহু একটি সংস্করণ পাওয়া যায়।
সার্বিকভাবে, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচ্য প্রতিবেদনটি জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুতর ও স্পর্শকাতর দাবি কীভাবে উপস্থাপন করেছে, তা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার মানদণ্ডে পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। বিশ্লেষণে দাবিগুলোর সমর্থনে দাপ্তরিক নথির উল্লেখ, সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিবেদনের বর্ণনার সামঞ্জস্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণের বিষয় এবং অনির্দিষ্ট সূত্র ও আবেগসূচক ভাষার ব্যবহার,এসব ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। এসব দিক প্রতিবেদনের তথ্যগত ভিত্তি, সূত্রের স্বচ্ছতা, ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনা ও বস্তুনিষ্ঠতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তবে এই পর্যবেক্ষণকে প্রতিবেদনের প্রতিটি দাবি মিথ্যা বা এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য ছিল,এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং সংশ্লিষ্ট নথি, বক্তব্য ও অন্যান্য স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে দাবিগুলোর সত্যতা ও প্রেক্ষাপট আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের ‘সিঙ্গেল কন্টেন্ট অ্যানালাইসিস’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মুনওয়ার আলম নির্ঝর ও মুহাম্মদ আবদুল মুকিম।