নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের সংবাদচিত্রে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের সংবাদমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান উঠে এসেছে। নেপাল ও ভুটানের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে মূলত আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে তুলে ধরা হলেও মালদ্বীপের সংবাদমাধ্যমে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে শ্রম অভিবাসন। একই সঙ্গে কিছু প্রতিবেদনে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ঘিরে নিরাপত্তা ও অপরাধের বিষয়ও সামনে এসেছে।

নেপালের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম কাঠমাণ্ডু পোস্টের ৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংসদ সদস্যদের জলবায়ু সহযোগিতা জোরদারের আহ্বানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ভুটানের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সংলাপে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড এবং আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মতো বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার গভীর সংহতি প্রকাশ করেছে বলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম খবর ছাপিয়েছে। নেপালের ত্রাণ ও উদ্ধারকার্যে সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা) অনুদান দিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা দ্বিপক্ষীয় পক্ষ হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানের একজন অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জলবায়ু সহযোগিতার প্রসঙ্গ বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল-ভুটানের সম্ভাব্য আন্তঃদেশীয় সংযোগের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ভুটানের জাতীয় সংবাদমাধ্যম কুয়েনসেলের এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতার ‘ন্যারেটিভ’ দেখা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

ভুটানের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে একটি ডাউনস্ট্রিম ক্লাইমেট-ভলনারেবল কান্ট্রি হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর জলবায়ু ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদী, আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ এবং বিদ্যুৎ সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশ ও হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতার একটি আঞ্চলিক চিত্র এখানে ফুটে ওঠে।

নেপাল নিউজের সাম্প্রতিক পর্যটনসংক্রান্ত প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিচয় উঠে এসেছে। আগস্টে নেপালে ৪ হাজার ৪৮৭ বাংলাদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন, যা মোট আন্তর্জাতিক পর্যটকের ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ নেপালের অন্যতম বড় পর্যটন উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। 

ফলে নেপালের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের আরেকটি ‘ন্যারেটিভ’ দাঁড়াচ্ছে ‘গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাজার’ হিসেবে। এখানে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং পর্যটন ও মানুষের আন্তঃসীমান্ত চলাচলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকে দেখা হয়েছে।

অন্যদিকে মালদ্বীপের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি অভিবাসনকেন্দ্রিক। সান অনলাইনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোতে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক এবং তাদের কর্মসংস্থান অন্যতম আলোচিত বিষয়।

এর আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মালদ্বীপে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ মালদ্বীপে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিল।

এই খবরে বাংলাদেশকে মূলত ‘শ্রমশক্তি সরবরাহকারী দেশ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ মালদ্বীপের অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখানে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির চেয়ে শ্রমবাজার ও অভিবাসনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

তবে এর বিপরীতে একই সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশিদের নিয়ে একটি নেতিবাচক নিরাপত্তা ‘ন্যারেটিভ’ও দেখা গেছে। সান অনলাইনের ৪ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে মালে শহরে মাদকবিরোধী অভিযানে নয় বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করা হয়।

সামগ্রিকভাবে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক খবর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের তিনটি পৃথক পরিচয় সামনে এসেছে। 

নেপালে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সহযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন বাজার, ভুটানে জলবায়ু ও জ্বালানি সহযোগিতার অংশীদার এবং মালদ্বীপে প্রধান শ্রমশক্তি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি মালদ্বীপের কিছু অপরাধ সংক্রান্ত খবরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ঘিরে নিরাপত্তা-সম্পর্কিত নেতিবাচক ফ্রেমিং তৈরি করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top