মুহাম্মদ আবদুল মুকিম
•••
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর কোলে ৭ মাস বয়সী সন্তানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জানা যায়, গত বছর সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই কিশোরীকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে গিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ে করে ২২ বছর বয়সী মো. শাকিল মিয়া।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এছাড়া আইনিভাবে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের কোনো বৈধতা নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে সম্মতি থাকলেও তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। এমন একটি স্পর্শকাতর, আইনি ও সামাজিকভাবে জটিল ঘটনা সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে কাভার করেছে এবং ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রে আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা কতটা মেনেছে, তা বিশ্লেষণ করতেই এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
গুগল সার্চ অপারেটরের সাহায্যে ‘১৩ বছরের মা’ ও সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া কিশোরীর নাম ব্যবহার করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন খুঁজে দেখা হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ৩৭টি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবপোর্টাল, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু সংবাদমাধ্যম কেবল তাদের ওয়েবপোর্টালে লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, আবার কিছু সংবাদমাধ্যম লিখিত ও ভিডিও উভয় মাধ্যমেই প্রতিবেদনটি প্রচার করেছে।
প্রকাশিত খবর, ভিডিও এবং ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টাল এই খবরটি প্রচার করার ক্ষেত্রে চরম অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ১৪ অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর নাম, ঠিকানা বা ছবি গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করা নিষেধ, যাতে তার পরিচয় প্রকাশ পায়। কিন্তু মনিটরিং ডেটা অনুযায়ী, একুশে টেলিভিশন, আরটিভি, এশিয়ান টিভি, বাংলা টিভি, দেশ টিভি, দৈনিক যুগান্তর, জাগো নিউজ, বার্তা২৪ সহ বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিচয় প্রকাশ করে স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন করেছে।
কিছু সংবাদমাধ্যম পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করলেও তা ছিল একেবারেই দায়সারা। ‘দৈনিক কালবেলা’, ‘দৈনিক দেশের পত্র’, ‘জুম বাংলা’ এবং ‘NPB News’-এর মতো মাধ্যমগুলো কিশোরীর মুখে হাত দেওয়া অবস্থার ছবি প্রকাশ করেছে। তবে ছবিগুলো এমন ছিল যেখান থেকে ভুক্তভোগীর পরিচয় সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। ‘খবরের কাগজ’ নামের সংবাদমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত তাদের ভিডিওর শুরুতে কিশোরীর মুখ দৃশ্যমান রাখে এবং পরবর্তীতে পুরো ভিডিওতে তা ঝাপসা করে দেয়।
সম্পাদনা প্রক্রিয়ার চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর প্রতিবেদনে। তারা তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনে কিশোরীর মুখমণ্ডল ঝাপসা করে প্রকাশ করলেও একই প্রতিবেদন ইউটিউবে পোস্ট করার সময় সেখানে তার মুখমণ্ডল দৃশ্যমান বা উন্মুক্ত রেখে দেয়।
যৌন নির্যাতনের শিকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতিমালায় কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও ‘নাগরিক টিভি’ ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রচার করেছে। ভিডিওতে তারা সাত মাসের শিশুটির মুখ ঝাপসা করে দিলেও ১৩ বছর বয়সী ভুক্তভোগী কিশোরী এবং তার পরিবারের সদস্যদের চেহারা উন্মুক্ত রেখেছে।
এতসব নেতিবাচক দৃষ্টান্তের মাঝেও গুটি কয়েক সংবাদমাধ্যম পেশাদারি ও নৈতিকতা বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন করেছে। ‘বিবিসি বাংলা‘, ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম‘ এবং ‘দৈনিক আজাদী‘-এর মতো মাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীর কোনো ছবি যুক্ত করেনি এবং তার পরিচয়ও প্রকাশ করেনি।
যেসব সংবাদমাধ্যম ছবি প্রকাশ করেছে (২৮টি)
(এর মধ্যে সরাসরি মুখমণ্ডল প্রদর্শন, ভুক্তভোগী/পরিবারের ভিডিও সাক্ষাৎকার, প্ল্যাটফর্মভেদে উন্মুক্ত রাখা কিংবা মুখে হাত দেওয়া কিন্তু পরিচয় শনাক্তযোগ্য ছবি অন্তর্ভুক্ত)
একুশে টেলিভিশন, দৈনিক কালবেলা, Our Times News, চাঁপাই জনপদ, রাইজিং সিলেট, Daily Comilla News, বাংলাদেশ বুলেটিন, আরটিভি, Newsg24, দৈনিক দেশের পত্র, crimebd24, আমার সংবাদ, Bangladesh Times, বার্তা ২৪, দেশ টিভি, জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর, NPB News, বাংলা টিভি, Daily Bangladesh, Mohona TV, Bd24report, নাগরিক টিভি, দিনকাল ডিজিটাল, Zoom Bangla, আমেরিকা বাংলা, এশিয়ান টিভি, খবরের কাগজ এবং দৈনিক যুগান্তর
যেসব সংবাদমাধ্যম ছবি প্রকাশ করেনি, তবে পরিচয় প্রকাশ করেছে (৫টি)
Bd Today Net, এনটিভি, সকালের সময়, আগামীর সময় এবং আজকের পত্রিকা
যেসব সংবাদমাধ্যম ছবি ও পরিচয় কোনোটিই প্রকাশ করেনি (৩টি)
দৈনিক আজাদী, বিবিসি বাংলা এবং বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর