তাহসিন ইমতিয়াজঃ বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর ‘সেফটি ট্র্যাকার’ এর মাসিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, হয়রানি ও প্রতিবন্ধকতার ঘটনাগুলো নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও দেশজুড়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করে এবং সেই সব ঘটনার তথ্য-উপাত্ত এই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪টি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় মোট ৭২ জন সাংবাদিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংবাদ সংগ্রহের সময় সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাই ছিল সবচেয়ে বেশি। মোট ২৩টি ঘটনায় ৩৯ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হন। ৬ ফেব্রুয়ারি শরীফ ওসমান হাদী হত্যার বিচারের দাবিতে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ আয়োজিত এক মিছিল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় প্রায় ১০ জন সাংবাদিক পুলিশের হামলার শিকার হন। একইভাবে ৮ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক দুটি ঘটনায় তিনজন সাংবাদিক আক্রান্ত হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পায়। বান্দরবান, হাতিয়া, নোয়াখালী, নাটোর এবং কক্সবাজারে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত সাতটি পৃথক হামলায় অন্তত ১১ জন সাংবাদিক আহত হন। এছাড়া নির্বাচন চলাকালীন একাধিক স্থানে সাংবাদিকদের পোলিং সেন্টারে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের হামলায় দুই সাংবাদিক আহত হন। একই দিনে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের ছবি তুলতে গিয়ে তিন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। এসব ঘটনার বাইরে হত্যাচেষ্টা, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং শারীরিক নির্যাতনসহ আরও ০৮টি হামলার ঘটনা বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর নথিভুক্ত করেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া এবং দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তারের দুটি পৃথক ঘটনায় মোট ২২ জন সাংবাদিককে আটক বা জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ টাইমস’এর অফিস সহকারীসহ ২১ জন গণমাধ্যমকর্মীকে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানকে সমালোচনা করে সংবাদ প্রচারের অভিযোগে সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। তাদের বিমানবন্দর এলাকার একটি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত ডিভাইসগুলো জব্দ করা হয়। একটি নিউজরুম থেকে একসঙ্গে এতজন সাংবাদিককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এছাড়া ১৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার সাংবাদিক মুহাম্মদ আসাদুল্লাহকে পুলিশ আটক করে। তার পরিবারের দাবি, পারিবারিক বিষয়সংক্রান্ত একটি “হয়রানিমূলক” মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা পোস্টের তথ্যমতে, তাকে একটি চেক জালিয়াতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উপরমহলের হুমকি ও রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষিতে ৩টি পৃথক ঘটনায় মোট ৯ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত বা বহিষ্কারের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রেসিডেন্টস বক্সে ছবি তোলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে “ডেইলি সান” এর ফটোসাংবাদিক তানভিন তামিমের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের হুমকি দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) । এই ঘটনার প্রতিবাদে ক্রীড়া সাংবাদিকরা ‘অদম্য কাপের’ ফাইনাল ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘এখন টিভি’ চার সাংবাদিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। অভিযোগ রয়েছে যে, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের কার্যালয়ে প্রবেশে বাধাও দিযয়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দেওয়া এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে জাতীয় প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ পাঁচজন সাংবাদিককে ক্লাব প্রাঙ্গণে নিষিদ্ধ করেছে। সাংবাদিকরা হলেন, গোলাম মুজতবা ধ্রুব, সাইফ আলী, সোহেলী চৌধুরী, সাজেদা হক এবং রহিমা খানম।
১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের শৌচাগার থেকে দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক আলী মাহমুদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও, বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও তাকে অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্তের লক্ষ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।