বাংলাদেশের নতুন সরকার নিয়ে ভারত-পাকিস্তান মিডিয়ার ভিন্ন কূটনৈতিক ফ্রেমিং

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও আসন্ন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবাদসম্মেলনের বার্তা ও বিএনপির রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই সংঘাতপূর্ণ দেশ ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম দুই দেশের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে একটা বিশ্লেষণ বের করার চেষ্টা করেছেন। দুই দেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিশ্লেষণকে মনিটর করেছে বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের সাউথ এশিয়া মনিটর ক্রনিকলার আয়াজ রাহমান।

পাকিস্তানের সাংবাদিক এজাজ সাঈদ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনের পর দেশটির গণমাধ্যম জিও নিউজে একটি বিশ্লেষণমূলক সংবাদ প্রকাশ করেছেন। যেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও নতুন সরকারকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্ভাবনার জন্য ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

পাকিস্তানের এই সাংবাদিক জিও নিউজে তুলে ধরেছেন, দীর্ঘ সময় ভারত বাংলাদেশের একমাত্র শেখ হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করাটা ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। যা পাকিস্তানের জন্য একটা ইতিবাচক সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছে।

যদিও তারেক রহমান তার সংবাদ সম্মেলনে ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে বার বার একবাক্যে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ার বার্তা দিয়েছেন। কারও সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলাদা কোনো সম্পর্ক না গড়ার বিষয়েও বার্তা দিয়েছেন।

তবে জিও নিউজের সাংবাদিক তারেক রহমানের এই বার্তাকে অবশ্য ইতিবাচক হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন। শেখ হাসিনা আমলে ভারত বাংলাদেশ যে ধরনের সম্পর্ক ছিল এবং যেখান থেকে ভারত অনেক সুযোগ সুবিধা পেয়েছে সেরকম সম্পর্ক ভারতের সাথে নতুন সরকারের হবে না এমন সম্ভাবনাই দেখছেন ঢাকায় সংবাদ সংগ্রহে থাকা পাকিস্তানের এই সাংবাদিক।

এছাড়া ঢাকা সফরে এই সাংবাদিক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেও পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যবর্তী মানুষের রাজনীতির বাইরে কালচারাল সম্পর্কের লেনদেন বোঝার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশে ‘ভারত বিরোধী’ মনোভাবের পিছনের কারণও জানার চেষ্টা করেছেন। তার প্রতিবেদনে তিনি তুলে ধরেছেন, বাংলাদেশের ভারত বিরোধী মনোভাব মূলত ভারতের রাজনীতি এবং ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা ক্ষোভ। এটা গোটা ভারতের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ না।

এছাড়া জিও নিউজের এই সাংবাদিক সংবাদ সম্মেলনে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্ন করেছিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। যেখানে তারেক রহমান সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার ইতিবাচক বার্তা দেন। পাকিস্তানের এই সাংবাদিক ও তার প্রতিবেদনে এটি তুলে ধরেন। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি ও ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপনে সার্কের ভূমিকাকে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সবার জন্যই ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে, তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকার নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমও নানা বিশ্লেষণ করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের মতে, জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিকে অপেক্ষাকৃত উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একই সাথে শেখ হাসিনা আমলে ভারত-লাদেশ সম্পর্কের যে “স্বর্ণযুগ” ছিল তা সমাপ্ত হয়েছে বলেও উপস্থাপন করেছে।

এছাড়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, তার পর নতুন করে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যম।

এছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তারেক রহমানের ফোনালাপ ও মোদির অভিনন্দন বার্তাকে বার বার কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম গুলো।

এছাড়া পাকিস্তানের জিও নিউজ ও ভারতের ইন্ডিয়া টুডে উভয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকই তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও বিএনপির জয়েন্ট সেক্রেটারি হুমায়ুন কবিরের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। যেখানে উভয় দেশের সাংবাদিকই শেখ হাসিনার বিষয়ে যার যার দেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করেছেন।

তবে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের জন্য যে অস্বস্তির তা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ কুন্ডু এর আচরণেও টের পাওয়া গেছে। সংবাদ সম্মেলনের পর তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দুইজনের সাথেই শেখ হাসিনার ফেরত আর দিল্লিতে অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন।

একই সাথে শেখ হাসিনার ইস্যুকে ভারতের সংবাদমাধ্যম গুলো আগের মতো নতুন সরকারের সাথেও সংখ্যালঘু বা বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়দের উপর হামলা নির্যাতনের সত্য কিংবা প্রোপাগাণ্ডা ইস্যু দিয়ে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করবে বলেই একটা ধারণা পাওয়া যায়।

অন্যদিকে ভারতের গণমাধ্যম গুলোর এ ধরনের প্রোপাগাণ্ডা ইস্যুর মাধ্যমে নেতিবাচক প্রভাব যেমন ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের গণমাধ্যম গুলোর সাংবাদিকতা বাংলাদেশের আরও কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে বলেই মনে হচ্ছে। যা পাকিস্তান বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থাপনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top